আমি একজন মা। এই পরিচয়ের বাইরে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য—আমি এক সময় গভীর হতাশা আর ভয় নিয়ে বেঁচে ছিলাম। ভয়টা ছিল আমার সন্তানের জন্য। আজ এই গল্প লিখছি কোনো চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়ার জন্য নয়, বরং একজন মায়ের হৃদয়ের কথা তুলে ধরার জন্য—যে হৃদয় আশার আলো খুঁজে পেয়েছিল হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মাধ্যমে।
আমার ছেলের বয়স তখন সাত। প্রায়ই ঠান্ডা লাগত, কাশি হতো, রাতে ঘুম ভেঙে যেত। প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো ঘন ঘন হতে লাগল। মাসে দুই-তিনবার অসুস্থ হওয়া আমাদের পরিবারের জন্য নিয়মিত দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল।
শিশু বিশেষজ্ঞ দেখিয়েছি, অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হয়েছে, নেবুলাইজার ব্যবহার করেছি। সাময়িক আরাম মিললেও কিছুদিন পর আবার একই অবস্থা। প্রতিবার অসুস্থ হলে আমার বুকের ভেতর অজানা আতঙ্ক কাজ করত—এই বুঝি বড় কোনো সমস্যা লুকিয়ে আছে।
একদিন এক আত্মীয়ের পরামর্শে একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের কাছে যাই। তিনি শুধু আমার ছেলের অসুখের কথা শোনেননি, জানতে চেয়েছেন তার ভয়, খাবারের রুচি, ঘুমের অভ্যাস, এমনকি সে কিসে কাঁদে, কিসে হাসে—সবকিছু।
আমি অবাক হয়েছিলাম। আগে কোনো চিকিৎসক এত গভীরভাবে আমার সন্তানের কথা শোনেননি।
ওষুধ শুরু হলো। চিকিৎসক স্পষ্ট করে বলেছিলেন—তাৎক্ষণিক ফল আশা করা ঠিক নয়। প্রথম এক মাসে খুব বড় পরিবর্তন দেখিনি। মাঝে মাঝে মনে হতো—আমি কি ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছি? কিন্তু মনকে শক্ত করে ধৈর্য ধরেছিলাম।
দ্বিতীয় মাসে লক্ষ্য করলাম—ছেলের ঘুম আগের চেয়ে ভালো। কাশির তীব্রতা কমেছে। সবচেয়ে বড় কথা—সে আগের মতো দুর্বল দেখাচ্ছে না। ধীরে ধীরে অসুস্থ হওয়ার ব্যবধান বাড়তে লাগল।
ছয় মাস পর আমি বুঝতে পারলাম—আমার সন্তানের শরীর যেন নিজে থেকেই লড়াই করতে শিখছে। অ্যান্টিবায়োটিকের উপর নির্ভরতা কমে গেছে। আমার বুকের ভেতরের সেই অজানা ভয়ও অনেকটা হালকা হয়ে এসেছে।
আমি জানি—সব শিশুর অভিজ্ঞতা একরকম নয়। হোমিওপ্যাথি কোনো জাদু নয়। তবে সঠিক চিকিৎসক, সঠিক পর্যবেক্ষণ আর ধৈর্য থাকলে এটি অনেক পরিবারের জন্য সহায়ক হতে পারে।
আমি একজন মা হিসেবে শুধু এটুকুই বলব—সন্তানের অসুস্থতায় তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেবেন না। সব চিকিৎসা পথ সম্পর্কে জানুন, প্রশ্ন করুন, বুঝে নিন। আর যেই পথই বেছে নিন, তা যেন হয় সন্তানের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে।
আজ আমার ছেলে স্কুলে নিয়মিত যায়, খেলাধুলা করে, হাসে। আমি জানি—এই সুস্থতার পেছনে শুধু একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, বরং ধৈর্য, সচেতনতা আর বিশ্বাসের বড় ভূমিকা আছে। আমার এই গল্প যদি কোনো মায়ের মনে সামান্য সাহস জোগায়, সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।