আমি কোনো চিকিৎসক নই, কোনো গবেষকও নই। আমি একজন সাধারণ মানুষ—যার জীবন এক সময় ব্যথা, হতাশা আর অনিশ্চয়তায় ভরে গিয়েছিল। আজ এই গল্প লেখার উদ্দেশ্য নিজের কৃতিত্ব জাহির করা নয়; বরং আমার মতো অসংখ্য মানুষের মনে যারা দীর্ঘদিনের যন্ত্রণায় ক্লান্ত, তাদের জন্য সামান্য আশা জাগানো।
আমার বয়স তখন পঁয়ত্রিশ। শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। দিনের বেশিরভাগ সময় বসে কাজ করতে হয়। হঠাৎ করেই শুরু হয় কোমরের ব্যথা। প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম—হয়তো বেশি সময় চেয়ারে বসে থাকার ফল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ব্যথা তীব্র হয়ে উঠল। সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট, অফিসে বসে থাকা দুর্বিষহ, রাতে ঘুম ভাঙে ব্যথায়।
ডাক্তারের পর ডাক্তার দেখালাম। এক্স-রে, এমআরআই, নানা পরীক্ষা। রিপোর্টে বড় কিছু ধরা পড়েনি, কিন্তু ব্যথা কমেনি। ব্যথানাশক ওষুধ খেলে সাময়িক আরাম মিলত, আবার ব্যথা ফিরে আসত দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে। ধীরে ধীরে শরীরের পাশাপাশি মনও ভেঙে পড়তে লাগল।
এই সময় এক সহকর্মী আমাকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার কথা বললেন। আগে কখনো গুরুত্ব দিয়ে ভাবিনি। মনে হতো—এগুলো ধীরে কাজ করে, আমার সমস্যার জন্য যথেষ্ট নয়। তবুও শেষ ভরসা হিসেবে একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের কাছে গেলাম।
তিনি শুধু আমার ব্যথার কথা শোনেননি; জানতে চেয়েছেন আমার ঘুম, খাবার, মানসিক চাপ, ভয়, রাগ—সবকিছু। প্রথমবারের মতো মনে হলো কেউ আমাকে একজন মানুষ হিসেবে দেখছেন, শুধু রোগী হিসেবে নয়।
ওষুধ শুরু হলো। প্রথম কয়েক সপ্তাহ তেমন পরিবর্তন বুঝতে পারিনি। মাঝেমধ্যে মনে হতো—এতে আদৌ কাজ হবে তো? কিন্তু চিকিৎসক আমাকে ধৈর্য ধরতে বলেছিলেন। ধীরে ধীরে লক্ষ্য করলাম—ঘুম একটু ভালো হচ্ছে, ব্যথার তীব্রতা কমছে, সবচেয়ে বড় কথা—মনটা শান্ত হচ্ছে।
তিন মাস পর আমি নিজেই অবাক। সকালে ঘুম থেকে উঠতে আর আগের মতো কষ্ট হয় না। অফিসে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করতে পারছি। ব্যথানাশক ওষুধের উপর নির্ভরতা কমে গেছে। পরিবারও লক্ষ্য করল—আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি হাসিখুশি।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে—চিকিৎসা শুধু ওষুধ নয়, এটি বিশ্বাস ও সম্পর্কের বিষয়ও। হোমিওপ্যাথি আমাকে শুধু ব্যথা থেকে মুক্তি দেয়নি; আমাকে নিজের শরীর ও মনের কথা শুনতে শিখিয়েছে।
আমি বলছি না—হোমিওপ্যাথি সব সমস্যার একমাত্র সমাধান। তবে এটি যে অনেকের জীবনে আশার আলো জ্বালাতে পারে, সেটি আমি নিজের জীবনে দেখেছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং ধৈর্য ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া।
আজ আমি সুস্থতার পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছি। পেছনে তাকালে মনে হয়—যদি সেই সময় হাল ছেড়ে দিতাম, তাহলে হয়তো আজ এই গল্প লেখা হতো না। আমার এই গল্প যদি একজন পাঠকের মনেও সামান্য সাহস জাগায়, সেটাই হবে এই লেখার সার্থকতা।