চিকিৎসা পেশা মানবসেবার এক মহান দায়িত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখানে রোগীর শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত তথ্য, পারিবারিক অবস্থা ও মানসিক দুর্বলতার মতো স্পর্শকাতর বিষয় জড়িত থাকে। এ কারণেই আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রোগীর গোপনীয়তা (Patient Confidentiality) ও চিকিৎসা নৈতিকতা (Medical Ethics) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মেডিকেল লিগ্যাল বিষয়।
রোগীর গোপনীয়তা বলতে বোঝায়—চিকিৎসা চলাকালীন প্রাপ্ত রোগীর সকল ব্যক্তিগত ও চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য তার অনুমতি ব্যতীত তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রকাশ না করা। রোগীর নাম, রোগ নির্ণয়, রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন, এমনকি চিকিৎসা গ্রহণের তথ্যও গোপনীয়তার আওতায় পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও আন্তর্জাতিক মেডিকেল আইন অনুযায়ী, রোগীর তথ্যের উপর সর্বপ্রথম অধিকার রোগীর নিজের।
রোগী চিকিৎসকের কাছে সম্পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে আসে। যদি রোগী মনে করেন তার ব্যক্তিগত তথ্য অনিরাপদ, তবে সে খোলামেলা তথ্য দিতে সংকোচ বোধ করবে, যা সঠিক চিকিৎসার অন্তরায় হতে পারে।
বিশেষ করে—
মানসিক রোগ
যৌন রোগ
এইচআইভি/এইডস
মাদকাসক্তি
এসব ক্ষেত্রে গোপনীয়তা লঙ্ঘন রোগীর সামাজিক, পারিবারিক ও পেশাগত জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশে সরাসরি “Patient Privacy Act” না থাকলেও—
পেনাল কোড
ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন
ভোক্তা অধিকার আইন
মেডিকেল কাউন্সিলের আচরণবিধি
এর মাধ্যমে রোগীর তথ্য ফাঁসকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। অনুমতি ছাড়া রোগীর তথ্য প্রকাশ করলে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আইনগত শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে।
সব ক্ষেত্রে গোপনীয়তা চূড়ান্ত নয়। কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে রোগীর তথ্য প্রকাশ আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয় হতে পারে, যেমন—
আদালতের নির্দেশে
সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে জনস্বার্থে
পুলিশি তদন্তে
রোগীর জীবন রক্ষার্থে
তবে এসব ক্ষেত্রেও শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্যই প্রকাশ করা উচিত।
চিকিৎসা নৈতিকতা হলো এমন কিছু নীতিমালা, যা চিকিৎসককে মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। এর চারটি মৌলিক স্তম্ভ হলো—
Autonomy – রোগীর সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা
Beneficence – রোগীর কল্যাণ সাধন
Non-maleficence – ক্ষতি না করা
Justice – ন্যায় ও সমতা বজায় রাখা
গোপনীয়তা রক্ষা এই নৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমানে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ডিজিটাল মেডিকেল রেকর্ড ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও বেড়েছে—
হ্যাকিং
অননুমোদিত অ্যাক্সেস
ডেটা লিক
আইন অনুযায়ী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে রোগীর তথ্য সুরক্ষায় পর্যাপ্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
রোগীকেও সচেতন হতে হবে—
রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন অযথা শেয়ার না করা
অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণে আপত্তি জানানো
গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হলে কর্তৃপক্ষকে জানানো
রোগীর গোপনীয়তা ও চিকিৎসা নৈতিকতা কেবল আইনগত বিষয় নয়—এটি মানবিকতা ও বিশ্বাসের ভিত্তি। একটি ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চিকিৎসক, প্রতিষ্ঠান ও রোগী—সবার সম্মিলিত সচেতনতা অপরিহার্য। মেডিকেল লিগ্যাল জ্ঞান এই সচেতনতার পথপ্রদর্শক।