আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক কেবল মানবিক বা পেশাগত নয়, বরং এটি একটি আইনগত সম্পর্কও। চিকিৎসা গ্রহণ ও প্রদান—উভয় ক্ষেত্রেই কিছু অধিকার, দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেগুলোকে সম্মিলিতভাবে বলা হয় মেডিকেল লিগ্যাল বিষয়াবলি। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতনতা না থাকলে চিকিৎসক যেমন আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, তেমনি রোগীও তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
মেডিকেল লিগ্যাল আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগীর সম্মতি। কোনো চিকিৎসা, পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচার করার আগে রোগীর কাছ থেকে অবগত সম্মতি (Informed Consent) নেওয়া আইনত বাধ্যতামূলক। রোগীকে তার রোগের অবস্থা, চিকিৎসার ধরন, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বিকল্প পদ্ধতি সম্পর্কে জানানো চিকিৎসকের দায়িত্ব।
শিশু, মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি বা অচেতন রোগীর ক্ষেত্রে অভিভাবক বা নিকট আত্মীয়ের সম্মতি গ্রহণ করা হয়। সম্মতি ছাড়া চিকিৎসা দেওয়া হলে তা আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
চিকিৎসকের প্রধান দায়িত্ব হলো সর্বোচ্চ পেশাগত সততা ও দক্ষতার সাথে চিকিৎসা প্রদান করা। যদি চিকিৎসক অসতর্কতা, অযোগ্যতা বা অবহেলার মাধ্যমে রোগীর ক্ষতি করেন, তাহলে সেটি Medical Negligence হিসেবে বিবেচিত হয়।
উদাহরণস্বরূপ—
ভুল ওষুধ প্রয়োগ
ভুল রোগ নির্ণয়
অস্ত্রোপচারে অসাবধানতা
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না করা
এসব ক্ষেত্রে রোগী বা তার পরিবার আইনগতভাবে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে রোগীর কিছু মৌলিক অধিকার স্বীকৃত। যেমন—
সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার
রোগ সংক্রান্ত তথ্য জানার অধিকার
চিকিৎসা নথি গোপন রাখার অধিকার
চিকিৎসা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার
চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো এসব অধিকার সম্মান করা। রোগীর তথ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
মেডিকেল লিগ্যাল ক্ষেত্রে চিকিৎসা নথি (Medical Records) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রেসক্রিপশন, রিপোর্ট, অপারেশন নোট—সবকিছু নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করা চিকিৎসকের আইনি দায়িত্ব।
আইনগত বিরোধ বা মামলার ক্ষেত্রে এই নথিগুলোই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নথি জাল করা বা গোপন করা গুরুতর অপরাধ।
মেডিকেল লিগ্যাল তথ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফরেনসিক মেডিসিন। অস্বাভাবিক মৃত্যু, দুর্ঘটনা, হত্যা বা আত্মহত্যার ক্ষেত্রে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আইনগত তদন্তের মূল ভিত্তি।
ফরেনসিক চিকিৎসককে নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিকভাবে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করতে হয়। ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট রিপোর্ট ন্যায়বিচারকে ব্যাহত করতে পারে।
বর্তমানে অনেক দেশে চিকিৎসা সেবাকেও ভোক্তা অধিকার আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অর্থাৎ রোগী একজন ভোক্তা এবং চিকিৎসা সেবা একটি পরিষেবা। সেবা প্রদানে ত্রুটি থাকলে রোগী আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
মেডিকেল লিগ্যাল তথ্য জানা কেবল আইনজীবী বা চিকিৎসকের জন্য নয়—বরং এটি রোগী, পরিবার ও সমাজের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা বাড়লে চিকিৎসা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। একটি মানবিক ও নিরাপদ স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে মেডিকেল ও আইনের এই সংযোগ অপরিহার্য।