বর্তমান সময়ের শিশুদের জীবনযাপন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন। প্রযুক্তিনির্ভরতা, কম শারীরিক পরিশ্রম, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে শিশুর স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। একটি শিশুর স্বাস্থ্য শুধু তার একার বিষয় নয়; এটি পুরো পরিবারের সচেতনতা ও অভ্যাসের প্রতিফলন। এই প্রবন্ধে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) বৃদ্ধিতে পরিবারের বাস্তব ও কার্যকর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হলো।
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হলো শরীরের সেই স্বাভাবিক শক্তি, যা জীবাণু, ভাইরাস ও নানা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। শিশুর ইমিউন সিস্টেম পূর্ণ বিকাশ পেতে সময় নেয়। তাই ছোট বয়সেই সঠিক যত্ন না পেলে শিশু ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে—
সংক্রমণ কম হয়
রোগ দ্রুত সেরে ওঠে
অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহার কমে
শিশুর মানসিক আত্মবিশ্বাস বাড়ে
শিশুর ইমিউন সিস্টেম গঠনে খাদ্যের ভূমিকা অপরিসীম।
পরিবারের করণীয়—
প্রতিদিন ফল ও শাকসবজি নিশ্চিত করা
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার (ডাল, ডিম, মাছ) দেওয়া
অতিরিক্ত ফাস্টফুড ও সফট ড্রিংক এড়িয়ে চলা
পর্যাপ্ত পানি পান করানো
মায়ের তৈরি সাধারণ খাবারই শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও উপকারী।
অনেক বাবা-মা শিশুর পড়াশোনার দিকে এত বেশি মনোযোগ দেন যে ঘুমের সময় কমে যায়। অথচ গভীর ঘুমের সময়ই শরীরে রোগপ্রতিরোধক কোষ সক্রিয় হয়।
বয়সভেদে শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা—
ছোট শিশু: ১০–১২ ঘণ্টা
স্কুলগামী শিশু: ৮–১০ ঘণ্টা
এটি ইমিউনিটি বাড়ানোর একটি সহজ কিন্তু কার্যকর উপায়।
খেলাধুলা শুধু শরীর নয়, মনও সুস্থ রাখে। নিয়মিত খেলাধুলা শিশুর রক্তসঞ্চালন বাড়ায় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সক্রিয় করে।
পরিবার চাইলে—
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বাইরে খেলতে উৎসাহ দিতে পারে
পরিবারসহ হাঁটা বা সাইক্লিং করতে পারে
এতে শিশুর সঙ্গে পরিবারের সম্পর্কও দৃঢ় হয়।
মানসিক চাপ শিশুর ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে। পরীক্ষার চাপ, পারিবারিক কলহ বা অবহেলা শিশুর শরীরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শিশুর মানসিক সুস্থতার জন্য—
তার অনুভূতির মূল্য দেওয়া
ভয় বা দোষারোপ না করা
নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা
এই বিষয়গুলো রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পরোক্ষ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিচ্ছন্নতা শিশুকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার প্রথম ধাপ।
পরিবারকে নিশ্চিত করতে হবে—
হাত ধোয়ার অভ্যাস
পরিষ্কার পোশাক ও নখ
বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার
এই ছোট অভ্যাসগুলো বড় রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
অনেক পরিবার এখন অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক এড়িয়ে চলতে চাইছে। এই ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অনেক শিশুর জন্য একটি কোমল ও সহনশীল বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, বিশেষ করে—
বারবার সর্দি-কাশি
এলার্জি
হজমজনিত সমস্যা
তবে যেকোনো চিকিৎসাই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে হওয়া উচিত।
শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি একটি ধারাবাহিক পারিবারিক প্রক্রিয়া, যেখানে বাবা-মা, দাদা-দাদি—সবাই ভূমিকা রাখতে পারেন।
সুস্থ অভ্যাসে অভ্যস্ত একটি পরিবারই পারে সুস্থ প্রজন্ম উপহার দিতে।
শিশুর স্বাস্থ্য মানেই পরিবারের ভবিষ্যৎ। আধুনিক জীবনের চাপে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লেও, সচেতন পরিবার চাইলে সহজ অভ্যাসের মাধ্যমেই তা শক্তিশালী করতে পারে। আজকের যত্নই আগামীর সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তুলবে—এই বিশ্বাসেই আমাদের পথচলা।