একটি সুস্থ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হলো সুস্থ পরিবার, আর সুস্থ পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হলো শিশু। শিশুর শারীরিক, মানসিক ও আবেগগত সুস্থতা শুধু তার ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎই নয়, বরং পুরো পরিবারের জীবনযাত্রা ও মানসিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। বর্তমান ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে শিশু ও পরিবারের স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।
শিশুকালেই মানুষের দেহের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশ ঘটে। এই সময় সঠিক পুষ্টি, পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
সুষম খাদ্য: দুধ, ডিম, শাকসবজি, ফলমূল ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করে।
ঘুম: বয়সভেদে ৮–১২ ঘণ্টা ঘুম শিশুর হরমোন নিঃসরণ ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শারীরিক খেলাধুলা: নিয়মিত খেলাধুলা শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং স্থূলতা প্রতিরোধ করে।
অনেক পরিবার শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্যের দিকে যতটা নজর দেয়, মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে ততটা দেয় না। অথচ শিশুর আচরণ, আত্মবিশ্বাস ও শেখার ক্ষমতা সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ
পরিবারের কলহ
বাবা-মায়ের সময় না দেওয়া
অতিরিক্ত মোবাইল ও স্ক্রিন টাইম
—এসব কারণে শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, ভয়, একাকিত্ব ও আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শিশুর প্রথম ও সবচেয়ে বড় বিদ্যালয় হলো পরিবার। বাবা-মায়ের আচরণ, কথা বলার ধরণ ও জীবনযাপন শিশুর উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
একটি স্বাস্থ্যকর পারিবারিক পরিবেশ গঠনের জন্য—
শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা
ভুল করলে ধৈর্যসহকারে বোঝানো
তুলনা বা অপমান না করা
সময়মতো প্রশংসা করা
—এই অভ্যাসগুলো অত্যন্ত কার্যকর।
শিশুরা সাধারণত সর্দি-কাশি, জ্বর, পেটের সমস্যা বা ত্বকের সমস্যায় বেশি ভোগে। এসব ক্ষেত্রে—
বারবার অ্যান্টিবায়োটিক এড়িয়ে চলা
প্রয়োজন অনুযায়ী অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
রোগ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা ও টিকা নিশ্চিত করা
—পরিবারের দায়িত্ব।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য একটি কোমল ও নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়, বিশেষ করে পুনরাবৃত্ত সংক্রমণ ও অ্যালার্জির ক্ষেত্রে।
বর্তমান যুগে শিশুদের জীবনে প্রযুক্তির প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুর চোখ, ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পরিবারের করণীয়—
নির্দিষ্ট সময়ের বেশি স্ক্রিন ব্যবহার না করা
পারিবারিক সময় (Family Time) নিশ্চিত করা
বই পড়া ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দেওয়া
শিশুকালেই যে অভ্যাস গড়ে ওঠে, তা আজীবন প্রভাব ফেলে। নিয়মিত হাত ধোয়া, সময়মতো খাবার খাওয়া, ঘুমানো ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা—এসব অভ্যাস শিশুকে ভবিষ্যতে সুস্থ জীবনযাপনে সহায়তা করে।
শিশু ও পরিবার স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সুস্থ শিশু মানেই সুস্থ পরিবার, আর সুস্থ পরিবার মানেই একটি শক্তিশালী সমাজ। শিশুর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য পরিবারকে সচেতন, ধৈর্যশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। আজকের সচেতনতা আগামীর সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলবে—এই বিশ্বাসই আমাদের পথচলার প্রেরণা।