HomeoSeba

অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথ ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকার

“হোমিওপ্যাথিতে সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ ও মানবিকতা” — ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

বাংলাদেশের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের পরিচিত নাম ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। প্রায় ৩০ বছরের চিকিৎসা অভিজ্ঞতায় তিনি অসংখ্য একিউট ও ক্রনিক রোগের সফল চিকিৎসা করেছেন। রোগীর প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, শাস্ত্রীয় জ্ঞানের গভীরতা এবং আধুনিক ভাবনার সমন্বয় তাঁকে আলাদা মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে। আমাদের ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে হোমিওপ্যাথির বর্তমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।


প্রশ্ন: আপনার হোমিওপ্যাথিতে আসার পেছনের গল্পটি জানতে চাই।

উত্তর: ছাত্রজীবনে আমি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাশাপাশি বিকল্প চিকিৎসা নিয়ে আগ্রহী ছিলাম। হোমিওপ্যাথির দর্শন—রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করা—আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। একজন মানুষকে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থাসহ সম্পূর্ণভাবে বোঝার সুযোগ এই চিকিৎসায় আছে, যা আমাকে এই পেশায় স্থায়ীভাবে যুক্ত করেছে।


প্রশ্ন: দীর্ঘ চিকিৎসা জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা কী বলে মনে করেন?

উত্তর: সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হলো—একই রোগ হলেও রোগী ভেদে চিকিৎসা ভিন্ন হয়। বইয়ের রোগ নয়, বাস্তব রোগীকে বুঝতে পারলেই সাফল্য আসে। অনেক সময় একটি ছোট মানসিক লক্ষণ পুরো কেসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়—এটাই হোমিওপ্যাথির সৌন্দর্য।


প্রশ্ন: নবীন চিকিৎসকরা সাধারণত কোন ভুলগুলো বেশি করেন?

উত্তর: সবচেয়ে বড় ভুল হলো তাড়াহুড়ো। রোগীকে সময় না দেওয়া, কেস টেকিং সংক্ষিপ্ত করা এবং রেপার্টরি বা সফটওয়্যারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। অনেকে মেটেরিয়া মেডিকা ভেরিফিকেশন বাদ দিয়ে শুধু রেপার্টরির ফলাফলের উপর ওষুধ দিয়ে দেন, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।


প্রশ্ন: আপনার মতে একটি ভালো প্রেসক্রিপশনের ভিত্তি কী?

উত্তর: একটি ভালো প্রেসক্রিপশনের তিনটি স্তম্ভ—

১) নিখুঁত কেস টেকিং

২) সঠিক রেপার্টরাইজেশন

৩) গভীর মেটেরিয়া মেডিকা জ্ঞান

এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ধৈর্য ও পর্যবেক্ষণ। প্রথম ডোজের পর কী করবেন, কখন অপেক্ষা করবেন—এই সিদ্ধান্তই চিকিৎসককে আলাদা করে।


প্রশ্ন: ক্রনিক রোগের ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথির ভূমিকা কতটা কার্যকর?

উত্তর: আমার অভিজ্ঞতায়, ক্রনিক রোগেই হোমিওপ্যাথির প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়। ডায়াবেটিস, চর্মরোগ, হাঁপানি, আর্থ্রাইটিস কিংবা মানসিক রোগ—সঠিক সিমিলিমাম পেলে রোগীর জীবনমান劇ভাবে পরিবর্তিত হয়। তবে রোগীকে ধৈর্য ধরতে শেখানোও চিকিৎসার অংশ।


প্রশ্ন: আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রেপার্টরি নিয়ে আপনার মতামত কী?

উত্তর: প্রযুক্তি অবশ্যই সহায়ক। ডিজিটাল রেপার্টরি, কেস আর্কাইভ, অনলাইন জার্নাল—এসব ব্যবহার করা উচিত। তবে প্রযুক্তি কখনোই চিকিৎসকের বিচারবুদ্ধির বিকল্প হতে পারে না। সফটওয়্যার সাহায্য করবে, সিদ্ধান্ত নেবে চিকিৎসক—এই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।


প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে হোমিওপ্যাথির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

উত্তর: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভুল চিকিৎসা চর্চা ও অতিরঞ্জিত প্রচারণা। দ্রুত ফল দেখানোর লোভে অনেকে নীতিগত সীমা অতিক্রম করেন, যা পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমাদের দায়িত্ব হলো প্রমাণভিত্তিক ও নৈতিক চিকিৎসা চর্চা নিশ্চিত করা।


প্রশ্ন: নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের জন্য আপনার বিশেষ পরামর্শ কী?

উত্তর: প্রথমত, ধৈর্য ধরুন। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত মেটেরিয়া মেডিকা পড়ুন—শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, রোগীর জন্য। তৃতীয়ত, রোগীর প্রতি আন্তরিক হোন। মনে রাখবেন, একজন রোগী আপনার কাছে শুধু চিকিৎসা নয়, বিশ্বাস নিয়ে আসে—এই বিশ্বাস রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।


প্রশ্ন: ভবিষ্যতে হোমিওপ্যাথিকে আপনি কোন জায়গায় দেখতে চান?

উত্তর: আমি চাই হোমিওপ্যাথি আরও গবেষণাভিত্তিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছাক। তরুণ চিকিৎসকরা যদি শাস্ত্র, নৈতিকতা ও আধুনিক চিন্তার সমন্বয় ঘটাতে পারে, তাহলে এই চিকিৎসা পদ্ধতির ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল।


উপসংহার

ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের এই সাক্ষাৎকার থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়—হোমিওপ্যাথিতে সাফল্য আসে কেবল ওষুধ দিয়ে নয়, বরং মানবিকতা, জ্ঞান ও ধৈর্যের সমন্বয়ে। অভিজ্ঞতার আলোকে দেওয়া তাঁর পরামর্শ নবীন ও অভিজ্ঞ—সব চিকিৎসকের জন্যই অনুপ্রেরণার উৎস।


Share This Article

Share on Facebook