চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা বা preventive medicine। অর্থাৎ রোগ হওয়ার আগে শরীরকে এমনভাবে প্রস্তুত করা যাতে রোগের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেমন টিকা বা স্বাস্থ্যবিধির মাধ্যমে প্রতিরোধের কথা বলা হয়, তেমনি হোমিওপ্যাথিতেও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির প্রবর্তক Samuel Hahnemann বিশ্বাস করতেন যে মানবদেহের ভেতরে একটি স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে, যাকে তিনি “Vital Force” নামে অভিহিত করেন। এই vital force শক্তিশালী থাকলে শরীর অনেক রোগের বিরুদ্ধে নিজেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
হোমিওপ্যাথিতে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাকে অনেক সময় “Prophylaxis” বলা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করা যাতে সংক্রামক বা মৌসুমি রোগ সহজে আক্রমণ করতে না পারে।
এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট রোগের প্রকৃতি এবং উপসর্গ অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট ঔষধ ব্যবহার করা হয়। এসব ঔষধ রোগের বিরুদ্ধে শরীরকে প্রস্তুত করে।
ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে মহামারী রোগের সময় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা উল্লেখযোগ্য ফল দিয়েছে। চিকিৎসকেরা আক্রান্ত রোগীদের লক্ষণ বিশ্লেষণ করে একটি “Genus Epidemicus” ঔষধ নির্ধারণ করেন।
Genus Epidemicus হলো সেই ঔষধ যা মহামারীর সময় অধিকাংশ রোগীর লক্ষণের সাথে সবচেয়ে বেশি মিল রাখে। এই ঔষধটি প্রতিরোধমূলকভাবে ব্যবহার করলে অনেক সময় রোগের প্রকোপ কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে ঋতু পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি রোগ দেখা যায়। যেমন—
সর্দি-কাশি
জ্বর
অ্যালার্জি
ডায়রিয়া
এই ধরনের রোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় উপযুক্ত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ আগেই ব্যবহার করলে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
উদাহরণস্বরূপ—
ঠান্ডা লাগা বা সর্দির প্রবণতায় কিছু নির্দিষ্ট ঔষধ সহায়ক হতে পারে
অ্যালার্জির প্রবণতায় constitutional remedy গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে
শিশুরা সাধারণত সংক্রমণজনিত রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি বিকশিত হয় না।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় শিশুদের জন্য কিছু constitutional remedy নির্বাচন করা হলে অনেক সময় দেখা যায়—
সর্দি-কাশির প্রবণতা কমে যায়
হজম শক্তি উন্নত হয়
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়
তবে এই ধরনের চিকিৎসা অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করা উচিত।
হোমিওপ্যাথি শুধু ঔষধের উপর নির্ভর করে না। সঠিক জীবনযাপনও রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
পর্যাপ্ত ঘুম
সুষম খাদ্য
নিয়মিত ব্যায়াম
মানসিক প্রশান্তি
পরিচ্ছন্নতা
এই বিষয়গুলো অনুসরণ করলে শরীরের vital force শক্তিশালী থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সাধারণত শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উদ্দীপিত করে। এজন্য অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে দীর্ঘদিন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা গ্রহণ করলে রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত হয়।
এর ফলে—
বারবার অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা কমে
শক্তি ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়
শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে
এই কারণেই অনেক চিকিৎসক হোমিওপ্যাথিকে একটি সমন্বিত বা holistic চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করেন।
প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা গ্রহণ করার সময় কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি।
সব রোগের ক্ষেত্রে একই ঔষধ ব্যবহার করা যায় না
সঠিক potency নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ
অতিরিক্ত ঔষধ ব্যবহার করা উচিত নয়
তাই প্রতিরোধমূলক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা গ্রহণের আগে অবশ্যই একজন দক্ষ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিরোধ সব সময় চিকিৎসার চেয়ে উত্তম। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিতে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সঠিক ঔষধ নির্বাচন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করলে অনেক সংক্রামক ও মৌসুমি রোগ থেকে সহজেই নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব।
বর্তমান যুগে স্বাস্থ্য সচেতনতার গুরুত্ব বাড়ার সাথে সাথে হোমিওপ্যাথির প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা পদ্ধতিও মানুষের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।